হাওজা নিউজ এজেন্সি: আকিদা ও ধর্মতত্ত্ববিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আবুল ফজল সাজেদি ধারাবাহিক বিভিন্ন আলোচনায় নতুন প্রজন্মকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করার বিভিন্ন পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আলোচনার বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
দুনিয়াকেন্দ্রিক জীবনধারা ও বস্তুগত ভোগ-বিলাসে অতিরিক্ত আসক্তি
প্রিয় অভিভাবক, আমরা যদি চাই আমাদের সন্তানরা নামাজের প্রতি আগ্রহী হোক এবং নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় করুক, তাহলে পারিবারিক জীবনে দুনিয়াবি বিষয়গুলোর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছেন এবং দুনিয়াকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, এই পৃথিবীতে আমাদের কাজ ও আমল দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনের কল্যাণ ও পরিণতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণিত হাদিসগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বস্তুগত বিষয় ও পার্থিব জীবনের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ নামাজের প্রতি মানুষের নিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সূরা জুমুআয় আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهْوًا انْفَضُّوا إِلَیْهَا وَتَرَکُوکَ قَائِمًا قُلْ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَیْرٌ مِنَ اللَّهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ وَاللَّهُ خَیْرُ الرَّازِقِینَ
“যখন তারা কোনো ব্যবসা বা খেল-তামাশা দেখতে পায়, তখন তারা সেদিকে ছুটে যায় এবং আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে যায়। বলুন, আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা খেল-তামাশা ও ব্যবসার চেয়ে উত্তম। আর আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।”
এই আয়াতে এমন একদল মানুষের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা নামাজের সময় উপস্থিত হওয়ার পরও ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনোদনকে নামাজের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং মহানবী (সা.)-কে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে চলে গিয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা তাদের এই আচরণের জবাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর কাছে যে কল্যাণ ও পুরস্কার রয়েছে, তা খেল-তামাশা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের চেয়ে অনেক উত্তম ও মূল্যবান।
এই আয়াত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, নামাজের সময় হলে নামাজকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি পরিবারের জীবনযাপন যদি এমনভাবে গড়ে ওঠে, যেখানে বস্তুগত বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং পার্থিব ভোগ-বিলাসকে মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহিত করা হয়, তাহলে সন্তানদের নামাজের প্রতি নিষ্ঠা দুর্বল হওয়ার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, বৈধ পার্থিব আনন্দ ও জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। বরং মূল বিষয় হলো—এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ততা থেকে বিরত থাকা এবং জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখা।
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতেও নামাজ পরিত্যাগ এবং প্রবৃত্তির অনুসরণের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ یَلْقَوْنَ غَیًّا
“অতঃপর তাদের পরে এমন উত্তরসূরিরা এলো, যারা নামাজ নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুসরণ করল। ফলে তারা অচিরেই ভ্রষ্টতার পরিণতির সম্মুখীন হবে।”
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী নবীদের পর এমন কিছু অযোগ্য উত্তরসূরি এসেছিল, যারা নামাজ অবহেলা করেছিল এবং নিজেদের প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুসরণে লিপ্ত হয়েছিল।
অর্থাৎ, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও পার্থিব আকাঙ্ক্ষায় অতিরিক্ত ডুবে যাওয়ার সঙ্গে নামাজ পরিত্যাগ বা নামাজের প্রতি অবহেলার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
মানুষ যত বেশি পার্থিব বিষয় ও ভোগ-বিলাসে ডুবে যায়, আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক ততই দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে পরিবারে বস্তুগত সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত।
পারিবারিক জীবনের কেন্দ্র যদি কেবল বস্তুগত আনন্দ, বিলাসিতা, অতিরিক্ত অতিথি আপ্যায়ন, বিভিন্ন আয়োজন ও বিনোদন হয়ে ওঠে, তাহলে সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সুতরাং, ইসলামী জীবনধারায় ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের অতিরিক্ততা ও অবহেলা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আপনার কমেন্ট